এক স্ত্রী, দুই স্বামী: ভারতের বিরল বৈবাহিক প্রথা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল আলোচনা
ভারতে সাধারণ বৈবাহিক ব্যবস্থার বাইরে একটি বিরল প্রথা আবারও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। হিমাচল প্রদেশের সিরমৌর জেলার একটি পরিবারে এক নারী দুই ভাইকে বিয়ে করেছেন। এই ধরনের বিবাহকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় Polyandry বা বহুপতিত্ব বলা হয়।
২০২৫ সালে ওই বিয়ের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। পরে ২০২৬ সালে ওই পরিবারে একটি শিশুর জন্মের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ঘটনাটি আবার সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনায় আসে।
Polyandry বা বহুপতিত্ব কী?
Polyandry হলো এমন একটি বৈবাহিক ব্যবস্থা যেখানে একজন নারী একই সময়ে একাধিক পুরুষের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে থাকেন। এর একটি বিশেষ রূপ হলো fraternal polyandry, যেখানে একজন নারী একই পরিবারের একাধিক ভাইকে বিয়ে করেন।
ভারতের কিছু পাহাড়ি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে অতীতে এই ধরনের প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আধুনিক সময়ে এটি অত্যন্ত বিরল হয়ে গেছে।
হিমাচল প্রদেশের ‘জোড়িদার’ প্রথা
সিরমৌর অঞ্চলের হাট্টি সম্প্রদায়ের কিছু এলাকায় ঐতিহাসিকভাবে Jodidara বা Jodidar নামে পরিচিত একটি প্রথার কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের আলোচিত ঘটনায় সুনীতা চৌহান নামে এক নারী প্রদীপ নেগি ও কপিল নেগি নামে দুই ভাইকে বিয়ে করেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে এই ধরনের বিবাহের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতে পাহাড়ি অঞ্চলে জমি ও পারিবারিক সম্পত্তি ভাগ হয়ে যাওয়া ঠেকানো এবং পরিবারের সম্পদ একত্রে রাখার মতো সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণের কথাও আলোচনায় এসেছে।
কেন এমন প্রথার সৃষ্টি হয়েছিল?
ইতিহাসে কিছু পাহাড়ি সমাজে কৃষিজমি সীমিত ছিল। একটি পরিবারের সম্পত্তি যদি একাধিক ভাইয়ের মধ্যে আলাদা হয়ে যেত, তাহলে ছোট ছোট অংশে জমি বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকত।
কিছু গবেষণামূলক ব্যাখ্যায় বলা হয়, একই পরিবারের ভাইদের একজন স্ত্রীকে বিয়ে করার মাধ্যমে জমি ও পারিবারিক সম্পদ একই পরিবারের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হতো। তবে এই ব্যাখ্যা সব পরিবার বা সব অঞ্চলের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য—এমনটা বলা যায় না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কেন এত আলোচনা?
একজন নারী এবং দুই ভাইয়ের বিয়ের ছবি ও ভিডিও আধুনিক ভারতীয় সমাজের প্রচলিত বিবাহের ধারণার থেকে আলাদা হওয়ায় সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কেউ এটিকে ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—আধুনিক সমাজে এই ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার, সম্মতি, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সন্তানের আইনি অবস্থান কীভাবে নির্ধারিত হবে।
অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু একটি বিয়ের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত পছন্দ, আইন এবং সামাজিক পরিবর্তন—সবকিছুই জড়িয়ে রয়েছে।
২০২৬ সালে আবার আলোচনায় কেন?
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পরিবারে একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। একজন স্বামী তখন বাড়িতে ছিলেন এবং অন্যজন বিদেশে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিশুর জন্মের খবর সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
এতে আবারও প্রশ্ন সামনে আসে—প্রাচীন সামাজিক প্রথা আধুনিক পারিবারিক কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এমন পরিবারের ক্ষেত্রে আইন ও সামাজিক স্বীকৃতির বিষয়গুলো কীভাবে কাজ করে।
সংস্কৃতি বনাম আধুনিক সমাজ
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু প্রাচীন সামাজিক ও বিবাহপ্রথা রয়েছে। সময়ের সঙ্গে শিক্ষার প্রসার, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং আধুনিক আইনি কাঠামোর কারণে অনেক ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়েছে বা পরিবর্তিত হয়েছে।
হিমাচলের এই ঘটনা সেই পরিবর্তনের একটি আলোচিত উদাহরণ। একটি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যকে বোঝার ক্ষেত্রে স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীন সম্মতি, মর্যাদা ও অধিকার বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনাকে কীভাবে দেখা উচিত?
এ ধরনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করার সময় শুধুমাত্র “অদ্ভুত” বা “অস্বাভাবিক” বলে মন্তব্য না করে এর পেছনের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করা দরকার।
একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি বা ভিডিও দেখে কোনো পরিবার সম্পর্কে অতিরিক্ত দাবি বা ব্যক্তিগত মন্তব্য করাও উচিত নয়।
উপসংহার
এক স্ত্রী ও দুই স্বামীর এই বিরল বিবাহপ্রথা ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি আলোচিত উদাহরণ। হিমাচল প্রদেশের এই ঘটনা দেখিয়েছে যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিবাহ ও পরিবার সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ব্যবস্থা ছিল।
২০২৫ সালের বিয়ের ঘটনা এবং ২০২৬ সালের শিশুজন্মের খবরের পর বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। তবে এই ধরনের ঘটনা বিচার করার ক্ষেত্রে সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত সম্মতি, নারী-পুরুষের অধিকার এবং প্রযোজ্য আইন—সবগুলো বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks for visiting